FIFA বিশ্বকাপে বলের ইতিহাস ও বিজ্ঞান প্রযুক্তির প্রয়োগ
Compiled by Asim Deb.
ফিফার তত্বাবধানে প্রথম বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় ১৯৩০ সালে। শুরুর কয়েক বছরে প্রতিটি আয়োজক দেশ নিজেরাই ম্যাচের বল সরবরাহ করত, এবং ফল খারাপ হলে অন্যান্য দেশগুলি বলের গুণমান ও কার্যকারিতা নিয়ে অনেক অভিযোগ দায়ের করে।
প্রথমে ছিল চামড়ার বল, পাম্প করে ব্লাডারে হাওয়া ভরে মুখে লেস দিয়ে বাঁধা। ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপে এলো প্রথম ফিতা বা ‘লেস’বিহীন বল; টিউব ভালভে পাম্প করে ব্লাডারে বাতাস ভরা হতো, এখানে ফিতে দিয়ে বলের মুখ বাঁধার ব্যাপার নেই। শুরু হয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রয়োগ – চামড়ার বলের ওজন কমানো, ঘাসের উপর ঘর্ষণজনিত কারণে বলের গতি কমে যাওয়া (speed loss due to friction with grass); বলের বাউন্স এবং ড্রপ করার পর রিবাউন্ড দূরত্ব; বাতাসে বলের ভারসাম্য (aerodynamics); ভেজা মাঠে বা বৃষ্টির সময় বলের চামড়া জল শুষে নিলে বল যেন ওজনে ভারী না হয়। তাই চামড়ার উপর সেলাই করা বলের পরিবর্তে এলো আঠা দিয়ে জোড়া লাগানো টেক্সচার প্যানেল, পরে আরও আধুনিক thermal bonding প্রযুক্তি। বলের chemical characteristics এবং electronic applications এর অনেক পরিবর্তিন হলেও বলের আকৃতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি, সব মিলিয়ে ফিফা বিশ্বকাপের একটি ফুটবলকে ম্যাচের শুরুতে ৪১০ থেকে ৪৫০ গ্রাম (১৪ থেকে ১৬ আউন্স) ওজনের হতে হয়। ‘সাইজ ৫’ (Size 5) মানের এই বলটির পরিধি ৬৮ থেকে ৭০ সেন্টিমিটারের মধ্যে হতে হবে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠে এর ভেতরে বাতাসের চাপ ০.৬ থেকে ১.১ অ্যাটমোস্ফিয়ারের মধ্যে থাকতে হবে। এখন আধুনিক বলের ভেতরে একটি সেন্সর থাকে যা মাঠের মাঝে বিতর্কিত সিদ্ধান্তের সময় টিভি প্যানেলে রেফারিদের (VAR) সাহায্য করবে।
১৯৬৬ সাল পর্যন্ত ফিফা বিশ্বকাপে ব্যবহৃত ফুটবলগুলো ছিল মূলত চামড়ার বল। ১৯৭০ সালে প্রথম বড় পরিবর্তনটি আসে, যখন ফিফা টুর্নামেন্টের বল সরবরাহের জন্য অ্যাডিডাস (Adidas) কোম্পানিকে দায়িত্ব প্রদান করে। এর সাথে শুরু হয় বল নির্মান প্রযুক্তিতে বৈজ্ঞানিক প্রয়োগ। পরিবর্তন এলো বলের শৈল্পিক সৌন্দর্য (look, cosmetics), যখন আয়োজক দেশ নিজেদের সভ্যতা, সংস্কৃতি তুলে ধরতে থিম (theme) ডিজাইন বলের সুচনা করলো। দূর থেকেও স্পষ্টভাবে দেখার জন্য ২০০২ সালে রঙিন বলের প্রচলন হয়। এভাবেই গত ৯৬ বছরে, বিশেষত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়কালে বল তার বাহ্যিক রূপ, প্রযুক্তি এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ায় নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে।
১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত প্রথম ফিফা বিশ্বকাপে কোনো নির্দিষ্ট ‘অফিসিয়াল ম্যাচ বল’ ছিল না। তখন ‘টিয়েন্টো’ (Tiento) ও ‘টি-মডেল’ (T-Model), এই দুই ধরনের হাতে তৈরি চামড়ার বল ব্যবহার হতো। উরুগুয়ে – আর্জেন্টিনা ফাইনাল ম্যাচে আয়োজক উরুগুয়ে তাদের নিজস্ব ‘টি-মডেল’ বলে খেলতে চেয়েছিল, অন্যদিকে আর্জেন্টিনা দলের কাছে ছিল ‘টিয়েন্টো’ বল। ফিফা এই অচলাবস্থা নিরসনে সিদ্ধান্ত নেয় যে, প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার টিয়েন্টো বল এবং দ্বিতীয়ার্ধে উরুগুয়ের ‘টি-মডেল’ বলে খেলা হবে। এই সিদ্ধান্তের প্রভাব ছিল নাটকীয়; প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা নিজেদের বলে ২-১ গোলে এগিয়ে গেলেও দ্বিতীয়ার্ধে উরুগুয়ে নিজেদের বলে ৪-২ ব্যবধানে জয়লাভ করে। বিবিসি-র তথ্যমতে, এই ম্যাচের মাধ্যমেই ফুটবলে ‘আ টেল অফ টু হাফস’ (A Tale of Two Halves) অর্থাৎ ‘দুই অর্ধে ভিন্ন চিত্র’ কথাটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
বলের প্রযুক্তি ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখার লক্ষ্যে ১৯৭০ সালে ফিফা অ্যাডিডাস (Adidas) কম্পানিকে বলের আনুষ্ঠানিক সরবরাহকারী নিযুক্ত করে। এটি এক সূচনা; উল্লেখ্য যে, প্রতিটি ফিফা বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টের জন্য বলের নকশা ও নামকরণ করা হতো নির্দিষ্ট কিছু মানদণ্ডের ভিত্তিতে।
২০১৪ সালে বিশ্বকাপের বলের জন্য ‘অ্যাডিডাস ব্রাজুকা’ (Adidas Brazuca) তৈরির দায়িত্ব পাকিস্তানের ফুটবল প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘ফরোয়ার্ড স্পোর্টস’-কে (Forward Sports) দেওয়া হয়। এরপর থেকে ২০২৬ পর্যন্ত এই কোম্পানি ২০১৮ বিশ্বকাপের জন্য ‘অ্যাডিডাস টেলস্টার ১৮’ (Adidas Telstar 18), ২০২২ বিশ্বকাপের জন্য ‘অ্যাডিডাস আল রিহলা’ (Adidas Al Rihla) এবং ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য ‘অ্যাডিডাস ট্রায়ন্ডা’ (Adidas Trionda) তৈরি করে।
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ: ট্রায়োন্ডা (TRIONDA)

স্প্যানিশ ভাষায় ‘ট্রায়োন্ডা’ (TRIONDA) শব্দটির অর্থ “তিনটি ঢেউ” (Three Waves); কারণ এই প্রথমবার কানাডা, মেক্সিকো এবং যুক্তরাষ্ট্র এই তিনটি দেশ যৌথভাবে ফিফা বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ। বলটির নকশায় লাল, সবুজ ও নীল রঙের বিন্যাস আয়োজক দেশ তিনটির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে। বলটিতে আয়োজক দেশের প্রতীকী চিহ্ন ফুটিয়ে তোলা হয়েছে; কানাডার জন্য ম্যাপল পাতা, মেক্সিকোর জন্য ঈগল এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি তারকা; পাশাপাশি সোনালি রঙের কারুকাজ ফিফা বিশ্বকাপের ট্রফির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে।
অত্যাধুনিক প্রযুক্তি:
TRIONDA- র গঠন বল বাতাসে ভেসে যাওয়ার সময় প্রয়োজনীয় ‘ড্র্যাগ’ (বায়ুর বাধা) অতিক্রম করে, বাতাসের মাঝে স্থিতিশীলতা বজায় রাখে। এছাড়া, এমবস করা কিছু চিহ্ন (embossed icons) যা কেবল কাছে থেকেই দেখা যায়; এগুলি ভেজা বা আর্দ্র আবহাওয়ায় বলকে শ্যুট করা বা ড্রিবল করার সময় সঠিক গ্রিপ বা নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করে। এতে যুক্ত হয়েছে অত্যাধুনিক ৫০০ হার্টজ (500Hz) মোশন সেন্সর চিপ-সহ ‘কানেক্টেড বল’ প্রযুক্তি, যা বলের প্রতিটি গতিবিধি রিয়েল-টাইমে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR) সিস্টেমে নির্ভুল তথ্য পাঠায়, যা ম্যাচ পরিচালকদের মাঠের মাঝে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণে, বিশেষ করে অফসাইডের মতো জটিল পরিস্থিতিতে সহায়তা করে।
২০২২ কাতার ফিফা বিশ্বকাপ: আল রিহলা (Al Rihla)
আরবি ভাষায় এই নামের অর্থ ‘যাত্রা’। এর নকশাটি আয়োজক দেশ কাতারের সংস্কৃতি, স্থাপত্যশৈলী, ঐতিহ্যবাহী নৌকা এবং জাতীয় পতাকার একটি প্রতীকী রূপ। বিশ্বকাপের ইতিহাসে অ্যাডিডাসের তৈরি ‘আল রিহলা’ সবথেকে দ্রুতগতি সম্পন্ন। ‘আল রিহলা’ বলে ‘কানেক্টেড বল’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, যা ম্যাচ পরিচালকদের দ্রুত ও নির্ভুল সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছে, বিশেষ করে সূক্ষ্ম অফসাইড সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে। এতে আছে গতি ও ধারাবাহিকতা নিশ্চিতকারী ‘সিআরটি-কোর’ (CRT-core) এবং নির্ভুলতা, বাতাসের স্থিতিশীলতা (aerodynamics) ও বলের বাঁক নেওয়ার ক্ষমতা (swerve) বাড়ানোর জন্য ২০-পিস প্যানেলের ‘স্পিডশেল’ (Speed shell) পলিউরেথেন আবরণ।

যদিও এটি ছিল ২০২২ ফিফা বিশ্বকাপের অফিসিয়াল ম্যাচ বল, তবে সেমিফাইনাল ও ফাইনাল ম্যাচের জন্য ব্যাবহার হয় ‘আল হিলম’ (Al Hilm) যার অর্থ ‘স্বপ্ন’। সোনালী টেক্সচারযুক্ত মূল রঙ এবং সূক্ষ্ম ত্রিভুজাকৃতির নকশার এই বলটি দোহা’র চারদিকের মরুভূমি, বিশ্বকাপের ট্রফির রঙ এবং কাতারের পতাকার নকশার প্রতীকী।
২০১৮ রাশিয়া ফিফা বিশ্বকাপ: টেলস্টার ১৮

টেলস্টার ১৮ (Telstar 18) বলে এনএফসি (NFC নিয়ার-ফিল্ড কমিউনিকেশন) চিপ যুক্ত ছিল, যার মাধ্যমে দর্শকেরা স্মার্টফোন ব্যবহার করে বলটির সাথে যোগাযোগ (interact) করতে পারতেন। গ্রুপ পর্বে টেলস্টার ১৮ ব্যবহৃত হয়েছিল এবং নকআউট পর্বে ব্যাবহার হয় লাল রঙের ‘টেলস্টার মেচতা’। রুশ ভাষায় ‘মেচতা’ শব্দটির অর্থ হলো ‘স্বপ্ন’ বা ‘আকাঙ্ক্ষা’। সেলাইয়ের পরিবর্তে নিখুঁতভাবে আঠা দিয়ে জোড়া লাগানো ছয়টি টেক্সচার প্যানেল দিয়ে তৈরি ‘টেলস্টার ১৮’ বলটি মসৃণ ও কম জল শোষণের ক্ষমতার পাশাপাশি অত্যন্ত নিখুঁত ও নির্ভুল গতিপথ নিশ্চিত করেছিল।
২০১৪ ব্রাজিল ফিফা বিশ্বকাপ: ব্রাজুকা (Brazuca)

তাইপেই-এর কোম্পানি ‘লং ওয়ে এন্টারপ্রাইজ’-কে প্রথমে চীনের গুয়াংডং (Guangdong) প্রদেশের শেনঝেন (Shenzhen)-এ অবস্থিত তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘ইয়া-ইয়র্ক প্লাস্টিক প্রোডাক্টস’-কম্পানির সাথে এই বলটি তৈরির চুক্তি হয়। ১৯৯৭ সাল থেকেই কোম্পানিটি অ্যাডিডাসের বল তৈরির সাথে যুক্ত ছিল। তবে, এই বলটির বিপুল চাহিদা লং ওয়ে মেটাতে ব্যর্থ হয়, তখন পাকিস্তানের শিয়ালকোটের প্রতিষ্ঠান ‘ফরোয়ার্ড স্পোর্টস’-কে বলটি তৈরির কাজে যুক্ত করা হয়। ১৯৯৫ সাল থেকেই অ্যাডিডাসের সাথে যুক্ত ফরোয়ার্ড স্পোর্টস এর আগে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এবং জার্মান বুন্দেসলিগার জন্যও ফুটবল সরবরাহ করেছিল। শিয়ালকোট থেকে ৪ কোটি ২০ লাখেরও বেশি ‘ব্রাজুকা’ (Brazuca) বল রপ্তানি করা হয়েছিল। প্রতিটি বলের গড় বিক্রয়মূল্য ছিল ১৬০ মার্কিন ডলার।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্য যে কোনো বলের তুলনায় ‘ব্রাজুকা’কে অনেক বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয় – ৬০০-এরও বেশি পেশাদার ফুটবলার, ৩০টি বিজ্ঞানী দল এবং বাধ্যতামূলক ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে এর গুণমান যাচাই করা হয়। প্রপেলারের মতো দেখতে ছয়টি অভিন্ন প্যানেল দিয়ে তৈরি ব্রাজুকার উপরিভাগের জ্যামিতিক গঠন ও প্রতিসাম্য (Symmetry) এমনভাবে ডিজাইন করা হয় যে এই বলে উন্নত অ্যারোডাইনামিক গুণমান, ব্যালেন্স, স্পর্শের অনুভূতি (টাচ) এবং গ্রিপ বা নিয়ন্ত্রণ সুবিধা পাওয়া যাবে।
বলটির নাম নির্বাচনের জন্য ১০ লাখেরও বেশি মানুষ ভোট দিয়েছিলেন এবং ৭৭% ভোটে ‘ব্রাজুকা’ নামটিই নির্বাচিত হয়। ব্রাজুকা তাঁদের একটি প্রচলিত শব্দ যা ব্রাজিলীয় জীবনযাত্রার প্রতি জাতীয় গর্ব গন্য করা হয়। বলের প্যানেলের রঙিন ও বাঁকা (curve) রেখাগুলি ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী ‘উইশ ব্রেসলেট’ বা ইচ্ছাপূরণের প্রতীকী ব্রেসলেটের প্রতিনিধিত্ব করে।
এর আগের দুটি টুর্নামেন্টের মতোই, ফাইনাল ম্যাচের জন্য অ্যাডিডাস সোনালী রঙের বাঁকানো রেখা সম্বলিত একটি বিশেষ সংস্করণ তৈরি করেছিল: ‘ব্রাজুকা ফাইনাল রিও’।
২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা ফিফা বিশ্বকাপ: জাবুলানি
জুলু ভাষায় ‘জাবুলানি’, এর অর্থ ‘উদযাপন করা’, বলটির ১১টি ভিন্ন রঙ মূলত একটি ফুটবল দলের খেলোয়াড় সংখ্যা, এবং ইংরেজি বাদে দক্ষিণ আফ্রিকার অন্যান্য ১১টি স্বীকৃত সরকারি ভাষা এবং আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত সর্বপ্রথম বিশ্বকাপের জন্য নির্বাচিত ৯টি শহরের স্মারক।

এই বলগুলি তৈরি হয় চিনে। এতে ব্যবহৃত হয়েছিল ভারতের ‘এনকে রাবার গ্রুপ’-এর ল্যাটেক্স ব্লাডার, তাইওয়ানের থার্মোপ্লাস্টিক পলিউরেথেন ইলাস্টোমার, এবং চীনের ইথিলিন ভিনাইল অ্যাসিটেট, আইসোট্রপিক পলিয়েস্টার / সুতির কাপড়, আঠা ও কালি। আটটি thermally bonded ৩ডি প্যানেল দিয়ে গঠিত এবং একটি নিখুঁত গোলকে ঢালাই করা জাবুলানি বলটিতে ছিল একটি ‘গ্রিপ এন গ্রুভ’ টেক্সচার, যা সকল পরিস্থিতিতেই নিখুঁত গ্রিপ এবং সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে সক্ষম।
ফাইনালের আনুষ্ঠানিক ম্যাচ বলটি ছিল একটি বিশেষ সোনালি সংস্করণ, যার নাম ছিল জো’বুলানি। আয়োজক দেশ জোহানেসবার্গে ফাইনালের ভেন্যুর নামে এর নামকরণ করা হয়।
২০০৬ জার্মানি ফিফা বিশ্বকাপ: টিমগাইস্ট
Teamgeist, যার অর্থ দলীয় চেতনা (team spirit), তার নতুন উৎপাদন প্রক্রিয়ার জন্য তাৎপর্যপূর্ণ ছিল, যার ফলে এটি একটি নিখুঁত গোলক হতে এক শতাংশেরও কম ঘাটতি ছিল। ‘অ্যাডিডাস +টিমগাইস্ট’ (Adidas +Teamgeist) বলটি অ্যাডিডাস এবং মোল্টেন কর্পোরেশনের যৌথ উদ্যোগে তৈরি করা হয়েছিল। এর নামের সাথে ‘প্লাস’ (+) চিহ্নটি যুক্ত করা হয় মূলত ট্রেডমার্ক বা বাণিজ্যিক স্বত্ব রক্ষার উদ্দেশ্যে; কারণ জার্মান শব্দ ‘টিমগাইস্ট’ (যার অর্থ ‘দলগত মনোবল’ বা ‘team spirit’)-কে সাধারণ শব্দ হিসেবে ট্রেডমার্ক করা সম্ভব ছিল না।
‘টিমগাইস্ট’-এর কালো ও সাদা রঙ আয়োজক দেশ জার্মানির ঐতিহ্যবাহী রঙের স্মারক এবং এর সোনালি রেখাগুলো বিশ্বকাপের ট্রফির সাথে একটি দৃশ্যমান সংযোগ স্থাপন করেছিল। ফাইনাল ম্যাচের জন্য অ্যাডিডাস ‘টিমগাইস্ট বার্লিন’ (Teamgeist Berlin) নামে বলের একটি বিশেষ সোনালি সংস্করণ তৈরি করে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো, প্রতিটি বলের গায়ে দুই দলের নাম, স্টেডিয়ামের নাম, শহরের নাম, তারিখ এবং খেলা শুরুর সময় উল্লেখ করা হয়েছিল।

জাপানের হিরোশিমার প্রতিষ্ঠান মোল্টেন কর্পোরেশন (কাবৌশিকি-গাইশা মোরুতেন, (Kabushiki- Gaisha Moruten) ক্রীড়া সরঞ্জাম ও গাড়ির যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারক একটি কোম্পানি, যারা আমেরিকান ফুটবল, অ্যাসোসিয়েশন ফুটবল (সকার), বাস্কেটবল, ডজবল, হ্যান্ডবল এবং ভলিবল তৈরির জন্য পরিচিত। মোল্টেন বাস্কেটবল বিশ্বজুড়ে ‘ফিবা’ (FIBA) র সব প্রতিযোগিতায় অফিসিয়াল বল হিসেবে ব্যবহৃত হয়; এছাড়া ‘ইউএসএ ভলিবল’ (USA Volleyball), এনসিএএ (NCAA)-র পুরুষ ও মহিলা চ্যাম্পিয়নশিপের জন্যও মোল্টেন অফিসিয়াল ভলিবল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান।
পূর্ববর্তী আটটি টুর্নামেন্টে ব্যবহৃত ষড়ভুজ ও পঞ্চভুজ আকৃতির প্যানেলের নকশার পরিবর্তে ‘টিমগাইস্ট’ বলে ১৪টি প্যানেল ব্যবহার করা হয়। এই প্যানেলগুলির নকশা ছিল অনেকটা প্রোপেলারের মতো এবং সেগুলোকে সেলাই করার পরিবর্তে thermally bonded প্রক্রিয়ায় একে অপরের সাথে যুক্ত করা হয়।
২০০২ কোরিয়া/জাপান ফিফা বিশ্বকাপ: ফিভারনোভা (Fevernova)
ফিভারনোভা বলটি তৈরি করে জার্মান কোম্পানি অ্যাডিডাস। হাতে সেলাই করা ‘ফিভারনোভা’ নামটি ‘ফিভার’ (fever) এবং ‘সুপারনোভা’ (supernova) শব্দ দুটির সংমিশ্রণে রাখা হয়। এর বাহ্যিক নকশা প্রথাগত ‘ট্যাঙ্গো’ বলের নকশা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল।

২০০২ সালের বিশ্বকাপ বলের নকশায় প্রথাগত ধারার পরিবর্তন আনা হয়; আগের ছয়টি বলের ‘ট্রায়াড’ বা তিন-অংশের নকশার পরিবর্তে এতে চারটি ত্রিভুজাকৃতি (trigonal) নকশা ব্যবহার করা হয়, যদিও পরিচিত ষড়ভুজ ও পঞ্চভুজ প্যানেলগুলি অপরিবর্তিত ছিল। বলের গায়ে থাকা চারটি ত্রিভুজাকৃতি নকশা ছিল wind turbine এর প্রতীক, যা বিকল্প শক্তির উৎসের উল্লেখ করে। বলটি ১১টি স্তরে (layers) গঠিত এবং ৩ মিমি পুরু; এর সিন্থেটিক ফোমের ভেতরে গ্যাস-ভর্তি বেলুন বা ক্যাপসুলযুক্ত একটি বিশেষ ফোম স্তর অন্তর্ভুক্ত ছিল। বলের বাইরের আবরণটি তৈরি করা হয় পলিউরেথেন এবং রাবারের সংমিশ্রণে। বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও নিখুঁত শট নেওয়ার জন্য সিন্থেটিক ফোমের স্তর ব্যবহার করে আরও cushioning দেওয়া হয়।
১৯৯৮ ফ্রান্স ফিফা বিশ্বকাপ: ট্রাইকলোর (Tricolore)

বলটির নাম ফ্রান্সের জাতীয় পতাকার রঙের সাথে সামঞ্জস্য রেখে করা হয়। বিশ্বকাপে এটি ছিল অ্যাডিডাসের প্রথম বহু-রঙিন (multi colour) বল এবং এই প্রথমবারের মতো সিন্থেটিক ফোম ব্যবহার করা হয়। ফরাসি বিপ্লবের সময় ব্যবহৃত রঙগুলির সাথে ফরাসি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতীকী সমন্বয় ঘটানোর লক্ষ্যে অ্যাডিডাসের ডিজাইন দল বিশটিরও বেশি খসড়া নকশা প্রস্তাব করে। ‘ট্রাইকলোর’-এর ত্রিভুজাকৃতি নকশাগুলিতে নীল, সাদা ও লাল রঙ ব্যবহার করা হয়। প্রতিটি নকশায় ফ্রান্সের জাতীয় প্রতীক তিনটি মোরগের ছবি ছিল, যার লাল ঝুঁটিটি অ্যাডিডাসের লোগোকে ফুটিয়ে তোলে।
‘ট্রাইকলোর’-এর ওপরের সিন্থেটিক ফোমের স্তরটি গ্যাস-ভর্তি মাইক্রো-বল দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। বলের গতি এবং ‘এনার্জি রিটার্ন’ (শক্তি ফেরত পাওয়ার ক্ষমতা) বাড়ানোর জন্য এগুলো যুক্ত করা হয় এবং আজও বিভিন্ন বলে এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়।
১৯৯৪ যুক্তরাষ্ট্র ফিফা বিশ্বকাপ: কোয়েস্ট্রা (Questra)

কোয়েস্ট্রার ত্রিভুজাকৃতি অংশগুলো (triads) গ্রহ, নক্ষত্র এবং রকেটের নকশা দিয়ে সাজানো হয়েছিল।
১৯৯০ ইতালি ফিফা বিশ্বকাপ: এট্রুস্কো ইউনিকো (Etrusco Unico)

মধ্য ও উত্তর ইতালিতে প্রায় ৮০০ থেকে ১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত বসবাসকারী এট্রুস্কান (Etruscan) জনজাতির নামানুসারে এই নামকরণ করা হয়। বলের ডিজাইনে প্রতিটি ত্রিভুজাকৃতি অংশে তিনটি মুখ খোলা সিংহের মাথ ছিল। এট্রুস্কান সংস্কৃতিতে এটি একটি অতি সাধারণ চিত্র, যা অনেক পাথরের ভাস্কর্য ও অলঙ্করণে দেখা যায় অ্যাডিডাসের তৈরি এটি বিশ্বকাপের প্রথম বল যাতে সম্পূর্ণ জল-প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং অধিক গতি নিশ্চিত করার জন্য কালো পলিউরেথেন ফোমের একটি অভ্যন্তরীণ স্তর ব্যবহার করা হয়।
১৯৮৬ মেক্সিকো ফিফা বিশ্বকাপ: অ্যাজটেকা (Azteca)
অ্যাডিডাসের ‘অ্যাজটেকা’ সম্পূর্ণ কৃত্রিম উপাদান দিয়ে তৈরি প্রথম বল। এই বলের জল শোষণের মাত্রা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে এবং ফ্রান্সে তৈরি এই বলটি অনেক টেকসই (durable) গন্য হয়ে ওঠে।
চতুর্দশ থেকে ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে ওই অঞ্চলে বসবাসকারী অ্যাজটেক জাতির নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় ‘অ্যাজটেকা’। এটি তৈরি হয় ‘ট্যাঙ্গো ডারলাস্ট’ (Tango Durlast) এবং ‘ট্যাঙ্গো এস্পানিয়া’ (Tango España)-র গঠনশৈলী অনুসরণে। এর ত্রিভুজাকৃতি অংশগুলোর নকশায় সামান্য পরিবর্তন আনা হয়, যেখানে আয়োজক দেশ মেক্সিকো এবং অ্যাজটেক জাতির স্থাপত্য ও ম্যুরালের প্রতিফলন ঘটানো হয়।
১৯৮২ স্পেন ফিফা বিশ্বকাপ: ট্যাঙ্গো এস্পানিয়া (Tango España)
অ্যাডিডাস নতুন ‘ট্যাঙ্গো এস্পানিয়া’-র ক্ষেত্রে সামান্য কিছু পরিবর্তন আনে। ষড়ভুজাকৃতি প্যানেলের ওপর ২০টি কালো ত্রিভুজাকৃতি নকশা (ট্রায়াড) এবং সেগুলোর সমন্বয়ে গঠিত ১২টি বৃত্তের বিন্যাস ছিল। বলে আবরণের সেলাইয়ের ওপর একটি বাড়তি সুরক্ষাস্তর যুক্ত হয়। স্পেনে অনুষ্ঠিত সেই টুর্নামেন্টের ৩০ বছর পর, পোল্যান্ড ও ইউক্রেনে আয়োজিত উয়েফা ইউরো ২০১২-এর অফিসিয়াল বলটির নাম রাখা হয় ‘ট্যাঙ্গো ১২’—যা ছিল সেই আগের বলটির প্রতি এক ধরণের সম্মাননা।
১৯৭৮ আর্জেন্টিনা ফিফা বিশ্বকাপ: ট্যাঙ্গো ডারলাস্ট (Tango Durlast)
ঊনবিংশ শতাব্দীর আর্জেন্টিনায় উদ্ভূত বিশ্ববিখ্যাত নাচের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়েছিল ‘ট্যাঙ্গো’। এটি বিশ্ববাসীর সামনে আকর্ষণীয় বাঁকানো ত্রিভুজাকৃতি নকশা (ট্রায়াড) তুলে ধরেছিল যা ছিল বল ডিজাইনের এক মাইলফলক এবং পরবর্তী পাঁচটি বিশ্বকাপেও এই নকশা অনুসরণ করা হয়েছিল। ফ্রান্সে তৈরি এবং হাতে সেলাই করা এই বলটিতে ‘ডারলাস্ট’ (Durlast) নামক জলরোধী আবরণ ব্যবহার করা হয়, যা ১৯৭০ ও ১৯৭৪ সালের ‘টেলস্টার’ (Telstar) বলগুলিতেও প্রয়োগ করা হয়েছিল।
১৯৭৪ পশ্চিম জার্মানি ফিফা বিশ্বকাপ: টেলস্টার ডারলাস্ট (Telstar Durlast)
পূর্বসূরি বলের আইকনিক নকশা অনুসরণ তৈরি ১৯৭০ ও ১৯৭৪ সালের ‘টেলস্টার’ বলগুলিতে ‘ডারলাস্ট’ প্লাস্টিক আবরণ ব্যবহার করা হয়। এই আবরণের ফলে বলগুলো জল ও কাদা-প্রতিরোধী হয়ে ওঠে; আর এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই পরবর্তী বলটির নামের সাথে ‘ডারলাস্ট’ শব্দটি যুক্ত করা হয়।
অ্যাডিডাস দুটি বল সরবরাহ করেছিল: সাদা রঙের ‘চিলি ডারলাস্ট’ (Chile Durlast), যা ফ্লাডলাইটের আলোয় খেলার জন্য ছিল আদর্শ, এবং কমলা রঙের ‘অ্যাপোলো ডারলাস্ট’ (Apollo Durlast) যা তুষারপাতের মধ্যেও ভালো দৃশ্যমানতা নিশ্চিত করত; তবে বাস্তবে কেবল সাদা ‘চিলি’ সংস্করণটিরই প্রয়োজন হয়েছিল।

পূর্ববর্তী দুটি বিশ্বকাপের তুলনায় একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ছিল যে, ম্যাচগুলিতে বলের নাম, প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের নাম এবং ‘অফিসিয়াল ওয়ার্ল্ড কাপ ১৯৭৪’ (Official World Cup 1974) কথাটি লেখা ছিল।
১৯৭০ মেক্সিকো ফিফা বিশ্বকাপ: টেলস্টার (Telstar)
১৯৭০ সালের বিশ্বকাপে প্রথমবার অ্যাডিডাস (Adidas) কম্পানিকে অফিসিয়াল বল সরবরাহকারী নিযুক্ত করা হয়, যা আজও অব্যাহত।
পশ্চিম জার্মানির সাবেক কিট ম্যানেজার আদি ডাসলার (Adi Dassler) প্রতিষ্ঠিত অ্যাডিডাসের প্রথম নিবেদন ছিল এই আইকনিক ‘টেলস্টার’ বলটি। ৩২টি প্যানেল (১২টি কালো পঞ্চভুজ ও ২০টি সাদা ষড়ভুজ) দিয়ে তৈরি এই বলের নকশাটি বিশ্বজুড়ে ফুটবলের প্রতীক হিসেবে বিপুল পরিচিতি পায়।
মহাকাশের যে উপগ্রহের (কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট) মাধ্যমে প্রথমবারের মতো সরাসরি আন্তর্জাতিক টেলিভিশন সম্প্রচার সম্ভব হয়েছিল, সেই উপগ্রহের নামানুসারেই এই বলটির নামকরণ করা হয়।

১৯৬৬ ইংল্যান্ড ফিফা বিশ্বকাপ: চ্যালেঞ্জ ৪-স্টার (Challenge 4-Star)
১৯৬৬ সালের টুর্নামেন্টের আগে ইংলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের কাছে ১০০টিরও বেশি বল জমা দেওয়া হয়, যার অধিকাংশেরই কোনো ব্র্যান্ড ছিল না। বিশেষজ্ঞদের একটি দল প্রতিটি বলের পরিধি, গোলাকার আকৃতি, ওজন, বাতাসের চাপ ধরে রাখার ক্ষমতা এবং ড্রপ করার পর রিবাউন্ড দূরত্ব, এগুলি পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখেন। এরপর টেনিস ও গলফ খেলার সরঞ্জামের জন্য বিখ্যাত ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান ‘স্লেঞ্জার’ (Slazenger) এর ‘চ্যালেঞ্জ ৪-স্টার’ (Challenge 4-Star) বলটি নির্বাচিত হয়। ২৫টি প্যানেলবিশিষ্ট এই বলটি সাদা, হলুদ ও কমলা রঙে পাওয়া যেত। সাদা রঙের বলটিই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছিল; তবে কমলা রঙের বলটিই টুর্নামেন্টের অবিচ্ছেদ্য প্রতীকে পরিণত হয়। কারণ, ইংল্যান্ড ও পশ্চিম জার্মানির সেই স্মরণীয় ফাইনালে কমলা রঙের বলটিই ব্যবহার করা হয়।

১৯৬২ চিলি ফিফা বিশ্বকাপ: মিস্টার ক্র্যাক (Mr Crack)
১৮টি চামড়ার টুকরো বা প্যানেল দিয়ে তৈরি ‘মিস্টার ক্র্যাক’-এর প্যানেলগুলো আগের বলগুলোর তুলনায় ছিল অধিক গোলাকার, যার ফলে বলটিকে দেখলে আরও নিখুঁত গোলক মনে হতো। এটিই ছিল ল্যাটেক্স ভালভযুক্ত প্রথম বিশ্বকাপ ফুটবল; এই ভালভের কারণে বলটি দীর্ঘ সময় ধরে তার আকৃতি ঠিক ধরে রাখতে সক্ষম ছিল।
১৯৬৩ সালে অ্যাডিডাস যখন ফুটবল তৈরি শুরু করে, তখন তাদের অন্যতম প্রথম বলটির নাম রাখা হয় ‘সান্তিয়াগো’। সেই টুর্নামেন্টের বলের প্রতি সম্মান জানিয়ে এবং ‘মিস্টার ক্র্যাক’-এর নকশার ওপর ভিত্তি করেই এটি তৈরি করা হয়েছিল। তবে ‘মিস্টার ক্র্যাক’-এর জল শোষণ ক্ষমতায় কিছু সমস্যা ছিল। এই কারণে ইউরোপের অনেকগুলি দল বিকল্প বল ব্যবহার করতে পছন্দ করত, যেমন ১৯৫৮ সালের ‘টপ স্টার’ বলটি, যা চেকোস্লোভাকিয়া ও হাঙ্গেরির মধ্যকার কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচের জন্য নির্বাচন করা হয়েছিল।
১৯৫৮ সুইডেন ফিফা বিশ্বকাপ: টপ স্টার (Top Star)
ফিফা ১০২টি ব্র্যান্ড নয় এমন ধরনের বলের একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। প্রস্তুতকারকদের নাম সিল করা ও নম্বরযুক্ত খামে রাখা হয়েছিল, যা বিশ্বকাপের লটারির পর খোলা হয়; এবং নির্বাচিত হয় ‘টপ স্টার’ বলটি। এটি ছিল তিনটি রঙের – হলুদ, হালকা বাদামী এবং সাদা। সাদা রঙের বলে ২৪টি চামড়ার টুকরো ছিল এবং আর্দ্রতা থেকে রক্ষার জন্য মোমের প্রলেপ দেওয়া ছিল।
১৯৫৪ সুইজারল্যান্ড ফিফা বিশ্বকাপ: সুইস ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন (Swiss World Champion)
গ্রিজ-মাখানো চামড়া দিয়ে তৈরি ‘সুইস ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন’ বলটির রঙ ছিল ঈষৎ হলুদ; এর ফলে আগের গাঢ় বাদামী রঙের বলগুলোর তুলনায় দর্শকদের পক্ষে এটি দেখা সহজ ছিল।
১৯৫৪ সালের ফাইনাল ম্যাচের বৃষ্টিভেজা ও কর্দমাক্ত পরিস্থিতিতে এই বৈশিষ্ট্যটি বিশেষ সহায়ক হয়েছিল। আশির দশকের আগে পর্যন্ত জলরোধী চামড়ার বলের প্রচলন না থাকায়, বার্নে অনুষ্ঠিত সেই ফাইনালে ‘সুইস ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন’ বলটি অনেকটাই জল শুষে নিয়েছিল এবং সময়ের সাথে সাথে বল ক্রমশ ভারী হয়ে পড়েছিল।
১৯৫০ ব্রাজিল ফিফা বিশ্বকাপ: সুপারবল ডুপলো টি (Superball Duplo T)
এতে ‘Industria Brasileira’ (ব্রাজিলীয় পণ্য) কথাটি লেখা থাকলেও, ‘সুপারবল ডুপলো টি’-এর পেটেন্ট মূলত আর্জেন্টিনার কোম্পানি ‘টোসোলিনি, ভালবোনেসি, পোলো অ্যান্ড সিয়া’ (Tossolini, Valbonesi, Polo & Cia)-র মালিকানাধীন ছিল; তারা এর নাম দিয়েছিল ‘সুপারভাল ডবল টি’ (Superval Doble T)। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রাজিলে একটি শাখা খোলার সুবাদে তারা বিশ্বকাপ বলের আনুষ্ঠানিক সরবরাহকারী হয়ে ওঠে এবং সামান্য কিছু পরিবর্তনের পর বলটিকে ‘সুপারবল ডুপলো টি’ হিসেবে নতুন রূপ দেওয়া হয়।
এটিই ছিল ফিতা বা ‘লেস’বিহীন প্রথম বিশ্বকাপ বল। এর ভেতরে বাতাস ভরার জন্য সরাসরি চামড়ার ১২টি অভিন্ন ও হাতে-সেলাই করা খণ্ডের (স্ট্রিপ) একটির মধ্যে ভালভ বসানো হয়েছিল, যার ফলে বলের উপরিভাগ আরও সুষম, গোলাকার ও নিশ্ছিদ্র হয়ে উঠেছিল। হালকা প্যানেলগুলোর গোলাকার প্রান্ত এবং সেলাইয়ের বাড়তি সুরক্ষা বলটিকে অধিক স্থায়িত্ব ও ভারসাম্য প্রদান করেছিল।
১৯৩৮ ফ্রান্স ফিফা বিশ্বকাপ: অ্যালেন (Allen)
১৯৩৪ থেকে ১৯৬৬ সালের মধ্যে ব্যবহৃত অন্যান্য সব অফিসিয়াল বিশ্বকাপ বলের মতোই, ‘অ্যালেন’ বলটিও আয়োজক দেশ ফ্রান্সের ‘অ্যালেন’ (Allen) নামক একটি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের তৈরি ছিল। এটিই ছিল প্রথম বিশ্বকাপ বল যাতে প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছিল; বলের উপরিভাগেই স্পষ্টভাবে ‘অ্যালেন’ ব্র্যান্ডের নামটি মুদ্রিত ছিল।

বলটিতে ১৩টি চামড়ার প্যানেল ছিল এবং এগুলো সুতির সুতা ও ফিতা দিয়ে সেলাই করা হয়েছিল। এর আগের ১৯৩৪ বিশ্বকাপের ‘ফেদেরালে ১০২’ (Federale 102)-এর মতোই ১৩টি প্যানেল ও সুতির সুতা দিয়ে তৈরি ‘অ্যালেন’ (Allen) ছিল আরেকটি বিশ্বকাপ বল, যার অলিম্পিক গেমসে ব্যবহারের ইতিহাস রয়েছে; এটি ১৯২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিক গেমসে ব্যবহৃত হয়েছিল।
১৯৩৪ ইতালি ফিফা বিশ্বকাপ: ফেদেরালে ১০২
‘ফেদেরালে ১০২’ ম্যাচ বলটি তৈরি করেছিল ইতালীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত রোম শহরের ক্রীড়া সরঞ্জাম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘ইকাস’ (ECAS – Ente Centrale Approvvigionamento Sportivi)। যদিও ‘ইকাস’ মূল ‘ফেদেরালে ১০২’ বলটি সরবরাহ করেছিল, তবে ফিফার তথ্যমতে, টুর্নামেন্ট চলাকালীন অংশগ্রহণকারী দেশগুলি ‘গ্লোব’ (Globe) এবং ‘জিগ-জ্যাগ’ (Zig-Zag) বলও ব্যবহার করেছিল; এই দুটি বলই ছিল ব্রিটিশ নির্মাতাদের তৈরি। উইলিয়াম সাইকস-এর তৈরি ‘জিগ-জ্যাগ’ বলটি ১৯৩০ সালের ‘টি-মডেল’-এর আদলেই তৈরি হয়েছিল, আর ফাইনাল ম্যাচের জন্য নির্বাচন করা হয়।
হাতে সেলাই করা ১৩টি চামড়ার প্যানেল দিয়ে গঠিত ‘ফেদেরালে ১০২’ বলটিতে ব্লাডার ঢোকানোর বা বাতাস ভরার ছিদ্রটি চামড়ার পরিবর্তে সুতির সুতা দিয়ে সেলাই করা হয়েছিল, যাতে হেড করার সময় ব্যাথা না হয়।

1930 Uruguay FIFA World Cup: T-model
১৯৩০ উরুগুয়ে ফিফা বিশ্বকাপ: টি-মডেল

হাতে সেলাই করা ‘টি’ (T) আকৃতির এগারোটি চামড়ার খণ্ড বা স্ট্রিপের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়েছিল ‘টি-মডেল’ (T-model); বিশ্বকাপের একেবারে প্রথম আসরের কয়েকটি ম্যাচে এই বলটি ব্যবহার করা হয়েছিল, সব ম্যাচে নয় । ১৯২৪ সালের প্যারিস এবং ১৯২৮ সালের আমস্টারডাম অলিম্পিক গেমসে ব্যবহৃত হওয়ার সুবাদে ‘টি-মডেল’ বলটি একটি নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হতো।
‘টি-মডেল’ বলটি তৈরি করে ইংরেজ ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘জন সল্টার অ্যান্ড সন’ (John Salter & Son) এবং মন্টিভিডিওর পরিবেশক প্রতিষ্ঠান ‘ক্লেরিসেটি অ্যান্ড বারেলা’ (Clericetti & Barrela) এটি উরুগুয়েতে আমদানি করে। গরুর চামড়ায় তৈরি এবং হাতে সেলাই করা ‘টি’ আকৃতির এগারোটি খণ্ড দিয়ে গঠিত এই বলটির ভেতরের ব্লাডার বা বাতাস ধারণকারী অংশটি আটকে রাখার জন্য মোটা চামড়ার ফিতা বা ‘লেস’ ব্যবহার করা হতো। আধুনিক টুর্নামেন্টগুলোর মতো ১৯৩০ সালের পুরো টুর্নামেন্টের জন্য কোনো একটি নির্দিষ্ট ‘অফিসিয়াল ম্যাচ বল’ ছিল না; দলগুলো তাদের নিজস্ব সরঞ্জাম সঙ্গে নিয়ে আসত। এর ফলে ১৯৩০ বিশ্বকাপের সেই বিখ্যাত ফাইনালে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল যেখানে প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার বল এবং দ্বিতীয়ার্ধে উরুগুয়ের ‘টি-মডেল’ বল ব্যবহার করা হয়েছিল।
বিশ্বকাপের প্রথম ফাইনাল ম্যাচটির জন্য রেফারি জন ল্যাঙ্গেনাস (John Langenus) উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনার অধিনায়কদের ম্যাচ বল বেছে নিতে বলেন। আয়োজক দেশ উরুগুয়ে ‘টি-মডেল’ বলটি চেয়েছিল, আর প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনা পছন্দ করেছিল ‘টিয়েন্টো’ (Tiento) বলটি। যখন কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হলো না, তখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে ম্যাচের দুই অর্ধে দুটি ভিন্ন বল ব্যবহার করা হবে।

References:
https://www.fifa.com/en/tournaments/mens/worldcup/canadamexicousa2026/official-match-ball
https://www.fifa.com/en/tournaments/mens/worldcup/canadamexicousa2026/articles/ball-balls-history
https://www.olympics.com/en/news/fifa-world-cup-ball
https://www.adidas.com/us/blog/the-complete-history-of-adidas-world-cup-match-balls
**********





Add comment